জোট ভাঙনের ইস্যুতে বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

জাতীয়

নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও তফসিল ঘোষণার দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সরব হঠাৎ রাজনৈতিক অঙ্গন। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যস্ত হয়ে উঠেছে নতুন নতুন জোট সম্প্রসারণে, অন্যদিকে শুরু হয়েছে পুরানো জোট ভাঙনের খেলা।

গত ১৩ অক্টোবর সরকারবিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দল গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বিএনপি, এই চার রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে সম্পৃক্ত থেকেও শেষ পর্যন্ত সেই জোটে স্থান হয়নি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে থাকা বিকল্পধারা বাংলাদেশ দলটির।

আর ১৬ অক্টোবর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে নিবন্ধিত দুটি রাজনৈতিক দল। একটি জেবেল রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপ ও অপরটি খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজার নেতৃত্বে থাকা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি।

অথচ ১৫ অক্টোবর বৈঠক শেষে ২০ দলীয় জোট নেতাদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানান, বিএনপির অংশ নেওয়া নতুন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানিয়েছে ২০ দলীয় জোট। তারা ঐক্যফ্রন্টের দেওয়া সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্যকে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু একদিন পরেই ২০ দলীয় জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায় দুটো রাজনৈতিক দল।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেন, ‘বাংলাদেশ ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটি পার্টি সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে। শুধু ক্ষমতার পালা বদলের নামে কোনো অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে আবারও দেশকে রাজনীতি-শূন্য করার কোনো অপচেষ্টায় অংশগ্রহণ করবে, তা একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা প্রত্যাশা করি না।’

বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি অভিযোগের আঙুল তুলে গাণি বলেন, ‘সব বিষয়ে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি সব সময়েই তার শরিকদের অন্ধকারে রাখার অপচেষ্টা গ্রহণ করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুবই কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রতীয়মান। সেই বিষয়েও বিএনপি তার শরিকদের পরিষ্কার অবস্থা ব্যাখ্যা করে না। জোটের বিভিন্ন বৈঠকে জোট শরিকদের মনোনয়নের বিষয়টি সামনে আনতে চাইলেও বিএনপি কৌশলে তা এড়িয়ে যায়।’

‘পক্ষান্তরে ১/১১ কুশীলব, মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নকারীরা যখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নামে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, তখন আমরা মনে করি বিএনপি তার নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ২০ দলীয় জোট শরিক হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাপ ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সাংবিধানিক, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থে আজকের এই মুহূর্ত থেকে জোটের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করছে।’

জোট ছেড়ে দুটো রাজনৈতিক দল বেরিয়ে যাওয়া নির্বাচনের আগে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা কিংবা শুরুতেই হোঁচট কি না—এমন প্রশ্নে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘জোট ভাঙা গড়ার মধ্যে ভালো কিছু হবে কিনা, সেটা দেখার বিষয়। রাজনীতিতে এখন মেরুকরণের সময়। সরকারের শেষ সময়ে এসে নতুনভাবে জোটবদ্ধ হওয়া জোট ভেঙে যাওয়া যদি দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, মানুষের মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা অগ্রসর হয় সে ক্ষেত্রে উভয় পদক্ষেপ মঙ্গলজনক হবে।’

‘এতে করে বিচলিত হওয়ার অবকাশ নাই। মোটকথা হচ্ছে আমরা সরকারকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে পারব কি না। আমাদের লক্ষ্য একটি অর্থবহ নির্বাচন আদায় করা। সে জন্য আন্দোলনে আছি। যদি অর্থবহ নির্বাচন না হয়ে সেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মতো একতরফা একটি সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করা হয় তাহলে নির্বাচনে যাওয়া আর না যাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। এতে করে জোট সম্প্রসারণ ও জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিছু যায় আসে না।’

ন্যাপ ও এনডিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না, তা এখনো অন্ধকারে। অন্যদিকে পরপর দুই নির্বাচনে অংশ না নিলে আরপিও অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিল হবে। এ কারণে দল দুটো চায়, প্রচলিত আইন মেনেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে।

একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে অংশ নিয়ে মূলত ২০ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিএনপিই মূলত জোটকে বিলুপ্ত করে দিতে চাইছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচন নিয়ে ২০ দলীয় জোট থেকে কোনো উদ্যোগ বা সংলাপ করেনি। যদিও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করতে গিয়ে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আসনের বিষয়ে বিএনপির আলোচনা প্রকাশ্যে এসেছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ন্যাপ ও এনডিপির নেতারা।

২০ দলীয় বৈঠক সূত্রে জানা যায়, ১৫ অক্টোবর সোমবার জোটের বৈঠকে, সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির অংশ নেওয়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ১/১১ সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও আছেন প্রশ্ন উঠায় বিব্রতবোধ করে শরিকদলগুলোর নেতাদের উদ্দেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এসব কথা তুলে এখন দোষত্রুটি খুঁজতে যাবেন না। গণ-আন্দোলনে ব্যক্তি, দল, জোট, যে যেখান থেকে সমর্থন করবে, সবাইকে আনতে হবে।’

জোটের শরিক একটি দলের নেতা আন্দোলন কীভাবে হবে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘শিগগিরই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বৈঠক হবে। আপনাদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে। যার ফলশ্রুতিতে ১৬ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বৈঠক করে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার দিন তারিখ নির্ধারণ করেছে।’

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক জোটের বৈঠকে অন্য জোটকে প্রাধান্য দিয়ে এসব কথা না বললেও পারতেন। জোট প্রধান ও দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে হঠাৎ কি কারণে, কি বুঝে এমন জবাব দিয়েছেন তা মির্জা ফখরুল সাহেবই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি জাতীয়তাবাদী শক্তির একজন সামান্য কর্মী হিসেবে শুধু এতটুকু বলব, রাজনীতিতে শুরু এবং শেষ বলে যেহেতু কোনো কিছুতে সীমারেখা নেই তাই সব বিষয়ে জবাব না দিলেও খুব একটা দোষ হতো না। শত হউক দীর্ঘ দুঃসময়ের পরীক্ষিত বন্ধুত্ব ছিল তো।’

একদিকে জোটবদ্ধ হয়ে কর্মসূচি ঘোষণা, অন্যদিকে নিজেদের জোট ছেড়ে সঙ্গী হারানো, এসবের মধ্যে ক্ষমতাসীনদের কোনো ধরনের ইঙ্গিত থাকতে পারে কী— প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বিএনপিকে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে ভাঙার ষড়যন্ত্র চলছে। এখনও ভাঙার ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। আর সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করতে মিথ্যা মামলায় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে যাওয়া আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা হয়েছে। মুক্তি পেতে আইনি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া হচ্ছে। কাজেই এমন তো হতে পারে নতুন জোট গড়া ও জোট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াটার মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগাম শুভ বার্তা বহন করে। শুধু খুঁজে নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ভালো হলে এগুলোকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নাই, সুযোগ থাকবে।’

এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া উভয় দল এ কথাও ঘোষণা দিয়েছে যে, বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা দিলেও আপাতত কোনো জোটে শরিক হবে না তারা। এ ক্ষেত্রে তারা আরও কিছুদিন উভয় দল একে অপরের সঙ্গে পরামর্শ করে পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে যেকোনো রাজনৈতিক মেরুতে ঐক্যবদ্ধ হতে আপত্তি থাকবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় একে অপরের সঙ্গে যেভাবে জোটবদ্ধ হয়, ঠিক একইভাবে দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোট ছেড়ে বেরিয়ে যায়। জোট ছেড়ে কখনও আবার একাই থাকে আবার কখনও নতুন করে জোটবদ্ধ হয়। এটাই যুগ যুগ ধরে চলা রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *