ম্যাশ-রা নিজেদের সস্তা ভাববেন-ই বা কেন?

খেলাধুলা

‘একটা ট্রফি দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই। নিজেকে এতো সস্তা ভাবি না।’ ছোট ছোট গোটা দুয়েক বাক্য। এই বাক্য দুটো একজন ক্রিকেটারের মুখ থেকে বেরিয়েছে। গণমাধ্যমে কিছু দিন আগে প্রচার হয়েছে। প্রকাশ হয়েছে। দিন দুয়েক আগে সেটা আবার বিভিন্ন দেশজ বিভিন্ন টেলিভিশনে পুনঃপ্রচার হয়েছে। কোথাও কোথাও পুণঃমুদ্রণও হয়েছে। কারণ, বাক্যগুলো যার কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়েছে তিনি মধ্য ত্রিশে পা রেখেছেন। তাঁর বয়স পঁয়ত্রিশ না ছত্রিশ সেটা কোন বিবেচ্য বিষয় নয়।

তিনি এদেশের তরুণ সমাজের বড় এক ‘আইকন’। সেটা শুধু ক্রিকেট খেলে না। বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করে না। আরো কিছু তাঁর ভেতর আছে। যেটা তাঁকে অন্যরকম একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁকে একটু অন্যভাবেই দেখেন এদেশের মানুষ। সুতরাং নিজেকে সস্তা ভাবার কোন কারণও তাঁর নেই। থাকতে পারে না।

কিন্তু তিনি যে সমাজে বেড়ে উঠেছেন। যে রাষ্ট্রের পতাকা তিনি দেশে-বিদেশে উঁচুতে তুলে ধরার নিরন্তর চেষ্টা করেন সেই সমাজ, রাষ্ট্রের বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের খুব সস্তা মনে করেন! যে কারণে ঐ ক্রিকেটারের শেষ বাক্যটা বার বার কানে বাজে। তাঁর মুখের ছোট বাক্যটা হয়তো একান্ত তাঁর। তবে এই সমাজের দিকে তাকালে সেটা বৃহত্তর চিন্তার পরিসর তৈরি করে দেয়।

সত্যি-ই নিজেকে সস্তা মনে করেন না; এমন মানুষের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে না কমছে! অনেক বাড় বাড়ন্তের মাঝেও ওরকম মানুষের সংখ্যাটা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সেটাই বাস্তবতা। আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চাই বা না চাই। তারপরও সময় মাঝে মধ্যে ওরকম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের। অনেক বড় ব্যক্তির মুখে খুব সস্তা কিন্তু বিস্ফোরক কথা শুনে আমরা চমকে উঠি। বিস্মিত হই, কত সস্তা কথা বের হয় তাঁদের মুখ থেকে!

তাঁদের কথার বিস্ফোরণে, হিংসাত্মক ঘটনা, রক্তপাত, অশান্তি, প্রাণহানি কত কিছু ঘটে যায়। কিন্তু তাঁরা নির্লিপ্ত থাকেন। থাকতে পারেন। আর গোটা দেশের মানুষেরও এসব কিছু এখন স্পর্শ করে না। নির্লিপ্ততার মাঝে সময় পার করতে পারাই তাদের কাছে এখন জীবনের অর্থও বটে!

কঠিন পরিস্থিতি আসলে চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিকতা এবং সহনশীলতা দিয়ে তাঁদের যেন আর প্রমাণ করার কিছু নেই। তারচেয়ে ভাল সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাতে লোকে একটু সস্তা ভাবলে কি এসে যায়! নিজেরতো লাভ ছাড়া কোন ক্ষতি হলো না। ব্যক্তির গুণাগুণের ভিত্তিতেই নাগরিকরা নিজেরা ভাগ্য তৈরি করতে পারেন। সমাজটাকে কিছুটা বদলাতে পারেন। এটা এখন নিছক কথার কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরকম একটা সময়ে যখন কোন এক তরুণ বলতে পারেন, নিজেকে এতোটা সস্তা ভাবি না। সত্যিই তাঁকে কুর্ণিশ করতে হবে। কারণ, তিনি প্রথাগত চিন্তা ও জীবন শৈলীর চিরায়িত ধ্যান-ধারণার মাঝে আটকে থাকতে চান না। বস্তুগত ছাঁচে ঢালা জীবন থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে হলে সত্যিই নিজেকে সস্তা না ভাবাই ভাল।

কিন্তু অংকের ভাষায় চিরায়িত রাজনৈতিক সমাজ ব্যবস্থার ছক ভাঙতে ওরকম ক’জন লোক এগিয়ে আসবেন? রাজনৈতিক অস্থিরতা আর হিংসার শিকার যে সমাজ তাঁকে বদলানোর জন্য দরকার নিজেকে সস্তা না ভাবা অধিক সংখ্যক লোকের। কিন্তু সেরকম লোক খুঁজে পাওয়াই দায়।

ক্রিকেট মাঠের বাইশগজে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, নিজের শরীরটাকে বার বার চিকিৎসকের অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিয়ে গিয়ে বার বার মাঠে ফিরে আসা ক্রিকেটার নজির গড়েছেন ক্রিকেটীয় প্রত্যাবর্তনে। তিনি পেরেছেন, কারণ, তিনি বার বার নিজেকে বদলাতে পেরেছেন।

যিনি নিজে বদলাতে পারেন, তিনি গোটা দলকে বদলানোর ক্ষমতা রাখেন। ভদ্রলোক সেটা করে দেখিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই ‘ টিম বাংলাদেশ’ হয়ে উঠেছে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিজেদের একটা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে বার বার প্রমাণ করেছেন, ট্রফি জিততে না পা পারলেও অন্য ব্র্যান্ডের ক্রিকেট খেলতে শিখেছেন তাঁরা। এই টিম বাংলাদেশের যিনি নেতা, ক্রিকেটোত্তর জীবনে তিনি কী জনগণের নেতা হতে চাইবেন?

এই উপমহাদেশে উদাহরণ কিন্তু আছে ভূরি ভূরি। তাঁর নিজের দেশেও আছে। কিন্তু এই দেশে রাজনীতিবিদদের খুব মূল্যবান ব্যক্তি হিসেবে দেখার লোক যে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। কারণ, তাঁদের ইমেজ সংকট। তারা নিজেরাই তাঁদের খুব সস্তা বানিয়ে ফেলেছেন। কখনো উর্দি পরা লোকগুলোর কাছে নিজের রাজনৈতিক সত্ত্বা বিক্রি করে। কখনো ক্ষমতার কাছে নিজের আদর্শ আর বিবেককে বিকিয়ে দিয়ে। অথবা রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজের ইমেজ, বিবেক সবকিছু বন্দক রেখেছেন ক্ষমতার ছিঁটেফোঁটা পাওয়ার জন্য।

একজন ক্রিকেটার নিজের ইমেজকে পুঁজি করে জনপ্রতিনিধি হতেই পারেন। হলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু অনেক শ্রম-ঘাম-রক্ত-ধুলোবালিতে মোড়ানো উজ্জ্বল ইমেজটা যদি খুব সস্তায় বিক্রি হয়ে যায়, তাহলেই সমস্যা। এদেশে এমপি, মন্ত্রী, প্রধান মন্ত্রী, অনেকে অনেক কিছু হয়েছে নিজেদের নীতি-আদর্শ-ইমেজ খুব সস্তা দরে বিক্রি করে। মানুষও কিন্তু খুব সল্প সময়ে তাঁদের মনে রেখেছেন। এখন ডিজিটাল জমানায় যারা খুব সস্তায় বিক্রি হয়ে যান, মানুষ মনের ওপর ‘ডিলিট’ শব্দটায় ক্লিক করতে বেশি সময় নেন না।

যে তরুণের মুখ থেকে শোনা বাক্য দিয়ে লেখাটার শুরু। তাঁর শেষ বাক্যটার মর্ম কথা দিয়েই শেষ করতে চাই লেখাটা। নিজেকে যারা খুব সস্তা মনে না করেন, মানুষ তাঁদেরই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। ইতিহাসও তাঁর অর্জনকে অন্যভাবে ধারণ করে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *